যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার পালাবদলে শেয়ারবাজারে নতুন হিসাব-নিকাশ
ওয়াল স্ট্রিটে বড় উত্থান, পতন তেলের দামে ও ডলারের; চাপে এআই ও প্রতিরক্ষা খাত
বিশেষ প্রতিনিধি, নিউইয়র্ক#
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর দেশটির শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছে উল্লেখযোগ্য উত্থান। কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার খবরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে বাজারের এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা সেন্টার ও প্রতিরক্ষা শিল্পের কয়েকটি খাতে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে, দুর্বল হয়েছে মার্কিন ডলার এবং বেড়েছে স্বর্ণের চাহিদা।
৪ নভেম্বর বুধবার নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান শেয়ার সূচকগুলোতে বড় উত্থান ঘটে। দিন শেষে ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ১ হাজার ৫৬৯ দশমিক ৪০ পয়েন্ট বা ৩ শতাংশ বেড়ে ৫৩ হাজার ৩৫৬ দশমিক ১২ পয়েন্টে দাঁড়ায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৭ হাজার ৬৮৮ দশমিক ৬২ পয়েন্টে এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ২৫ হাজার ৭৩৬ দশমিক ৫১ পয়েন্টে লেনদেন শেষ করে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে আসা এবং ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। ঐতিহাসিকভাবেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে শেয়ারবাজারে উত্থানের প্রবণতা দেখা যায়।
ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন, বাজারে স্বস্তি
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রিপাবলিকানরা এখন আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত এবং সরকারি নীতির ওপর নজরদারির সুযোগও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের।
বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করছে, কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হলে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন কিংবা বিতর্কিত আইন পাসের সম্ভাবনা কমে আসতে পারে। এতে অর্থনীতিতে আকস্মিক পরিবর্তনের ঝুঁকি কিছুটা কমবে।
ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম এক্সটিবির গবেষণা পরিচালক ক্যাথলিন ব্রুকসের মতে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা রাজনীতির জন্য নেতিবাচক হলেও শেয়ারবাজারের জন্য অনেক সময় ইতিবাচক হতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার সূচকগুলোতে ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী উত্থানের প্রবণতাও রয়েছে।
তেলের দামে বড় পতন, দুর্বল ডলার
শুধু শেয়ারবাজার নয়, নির্বাচনের ফলাফলের পর আন্তর্জাতিক পণ্য ও মুদ্রাবাজারেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। ৪ নভেম্বর ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। পরদিনও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে অবস্থান করে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দামের এই পতনের পেছনে ইরান যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক অবস্থানে সংযম আসতে পারে এবং সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়তে পারে,এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
নির্বাচনী পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে বলে ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন। সংঘাত কমে এলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমতে পারে।
এদিকে ডলারের দর অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে দুর্বল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের মুনাফার হারও কমেছে। অন্যদিকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বেড়েছে।
এআই ও প্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্বেগ
শেয়ারবাজারের সামগ্রিক উত্থানের মধ্যেও প্রযুক্তি খাতের সব কোম্পানি সমানভাবে লাভবান হয়নি। বিশেষ করে এআই অবকাঠামো, চিপ উৎপাদন এবং ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে চাপ তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের ফলে এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ, ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে টেক্সাস ও জর্জিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের বিরোধিতা নির্বাচনে একটি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী IREN, Hut 8, Applied Digital এবং Core Scientific-এর শেয়ারে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। অন্যদিকে অ্যামাজন, মেটা ও অ্যালফাবেটের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে উত্থান দেখা গেছে।
সিটি রিসার্চের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক ইকুইটি কৌশল বিভাগের প্রধান স্কট ক্রোনার্টের মতে, এআই অবকাঠামো নির্মাণের গতি কমে গেলে এ খাতের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে এআই শিল্পে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
প্রতিরক্ষা শিল্পে চাপ, সৌর জ্বালানিতে উত্থান
নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পেও। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট কংগ্রেসে অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে পারে বলে বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন। এর ফলে নর্থরপ গ্রুম্যান, আরটিএক্স ও লকহিড মার্টিনের মতো বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে দরপতন হয়েছে।
অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে উত্থান দেখা গেছে। ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে। এ প্রত্যাশায় ইনভেসকো সোলার ইটিএফের মূল্য একদিনে প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন টেসলার শেয়ারের দরও কমেছে। ইউরোপের ট্রেডগেট প্ল্যাটফর্মে টেসলা ও স্পেসএক্স-সংশ্লিষ্ট লেনদেনে দরপতনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে স্পেসএক্স টেসলার মতো সাধারণ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। তাই প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রকাশিত দরপতনের তথ্যকে প্রচলিত স্টক এক্সচেঞ্জের সমাপনী শেয়ারদর হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পেছনে মাস্কের বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও এ পরিস্থিতিতে আলোচনায় এসেছে।
এশিয়ার বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের প্রভাব এশিয়ার শেয়ারবাজারেও পড়েছে। ৫ নভেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং তাইওয়ানের বাজার প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে হংকং, ভারত ও মালয়েশিয়ার বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এশিয়ার প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে ডেটা সেন্টার নির্মাণে সম্ভাব্য বিধিনিষেধের আশঙ্কা এসব বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিপরীতে তেলের দাম কমার ফলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা দেখছে।
ট্রাম্পের কৃতিত্ব দাবি, তবে সামনে অনিশ্চয়তা
শেয়ারবাজারের উত্থানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে নিজের প্রশাসনের সাফল্য হিসেবে বাজারের রেকর্ড উচ্চতার কৃতিত্ব দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি লিখেছেন, শেয়ারবাজার নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে এবং মার্কিন নাগরিকদের অবসরকালীন বিনিয়োগের মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর একদিনের উত্থানকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে আসা, তেলের দাম হ্রাস এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা আপাতত বাজারকে সহায়তা করছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, সুদের হার এবং এআই খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
৫ নভেম্বরের বাজার পরিস্থিতিতেও এই দ্বিমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে তেলের দাম কমায় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে স্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে এআই ও প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের দলের নির্বাচনী পরাজয়ের পর ওয়াল স্ট্রিটে স্বস্তির উত্থান ঘটলেও বিশ্ববাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী করেছে, কিন্তু প্রযুক্তি, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতে সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তন আগামী দিনগুলোতে বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।##তথ্যসূত্র: Associated Press, Reuters

