-- বিজ্ঞাপন ---

পৃথিবীর পানি কি পৃথিবীই তৈরি করেছে? বিজ্ঞানীদের নতুন চমক

কাজী আবুল মনসুর#

পৃথিবীর বিস্তীর্ণ সমুদ্রের দিকে তাকালে মনে হতে পারে, এই নীল গ্রহ যেন চিরকালই পানিতে পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর জন্মের সময় এর পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রচণ্ড উত্তাপ, গলিত পাথর আর হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডলে ঘেরা নবগঠিত পৃথিবীতে বর্তমানের মতো পানি ছিল কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। পৃথিবীর পানির উৎস অনুসন্ধানে এবার নতুন একটি সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর গবেষকেরা। তাঁদের গবেষণা বলছে, পৃথিবী গঠনের সময় তার নিজস্ব পাথুরে উপাদান ও হাইড্রোজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পানি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

গবেষকদের পরীক্ষাগারে দেখা গেছে, উত্তপ্ত পরিবেশে পাথরের ভেতরে থাকা আয়রন অক্সাইড বা লোহার অক্সাইড হাইড্রোজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ধাতব লোহা ও পানি তৈরি করতে পারে। এই ফলাফল থেকে গবেষকেরা ধারণা করছেন, পৃথিবীর প্রাথমিক গঠনের সময় এমন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি উৎপন্ন হয়ে থাকতে পারে। তবে গবেষণাটি পৃথিবীর পানির উৎস নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি একটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার পরীক্ষামূলক প্রমাণ, যা পৃথিবীর পানি কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই প্রশ্নের নতুন ব্যাখ্যা দিতে পারে।

পৃথিবীর জন্মের সময় পানি কোথায় ছিল?

পৃথিবী ও সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের জন্ম হয়েছিল সূর্যকে ঘিরে থাকা গ্যাস, ধূলিকণা ও পাথুরে উপাদানের একটি বিশাল ঘূর্ণায়মান চাকতি থেকে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিস্ক’। সূর্যের কাছাকাছি অঞ্চলে তাপ ও বিকিরণ এতটাই তীব্র ছিল যে পানির অণু টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই পরিবেশে পানির অণু ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে, সৌরজগতের বাইরের অপেক্ষাকৃত শীতল অঞ্চলে বরফ ও পানিসমৃদ্ধ উপাদান টিকে থাকার সুযোগ ছিল বেশি। তাহলে পৃথিবী যখন সূর্যের কাছাকাছি অঞ্চলে তৈরি হলো, তখন তার পানি এল কোথা থেকে? দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল, পৃথিবীর পানি এসেছে বরফসমৃদ্ধ ধূমকেতু, গ্রহাণু ও উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে। এসব মহাজাগতিক বস্তু সৌরজগতের অপেক্ষাকৃত শীতল অঞ্চলে তৈরি হয়েছিল। পরে পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে পানি বা পানির উপাদান সরবরাহ করতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি পৃথিবীর নিজস্ব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পানি তৈরির সম্ভাবনাও বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।

পৃথিবীতে কত পানি রয়েছে, কতটুকু মিষ্টি?

পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রায় ৭১ শতাংশ পানি দিয়ে ঢাকা। কিন্তু এই বিশাল জলরাশির অধিকাংশই মানুষের সরাসরি ব্যবহারের উপযোগী নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA)-এর তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে মোট পানির পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ঘনকিলোমিটার। এর প্রায় ৯৭ শতাংশই লবণাক্ত পানি, যা মূলত মহাসাগরগুলোতে রয়েছে। বিপরীতে, মিষ্টি পানির পরিমাণ মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি।

এই সামান্য মিষ্টি পানিরও বড় অংশ মানুষের সহজে ব্যবহারের সুযোগ নেই। মিষ্টি পানির প্রায় ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ হিমবাহ ও মেরু অঞ্চলের বরফে জমা রয়েছে। প্রায় ৩০ শতাংশ রয়েছে ভূগর্ভে। নদী, হ্রদ ও অন্যান্য উন্মুক্ত জলাশয়ে রয়েছে মিষ্টি পানির খুব সামান্য অংশ।

অর্থাৎ, পৃথিবীতে পানির প্রাচুর্য থাকলেও সহজে ব্যবহারযোগ্য মিষ্টি পানির প্রাপ্যতা অত্যন্ত সীমিত। আর এই পানির উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

পাথুরে কণার বৃষ্টি থেকে পানি তৈরির ধারণা

বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী গঠনের সময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথুরে কণা একত্রিত হয়ে ধীরে ধীরে বড় গ্রহ তৈরি করেছিল। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘পেবল অ্যাক্রিশন’ (Pebble Accretion)। পৃথিবী যত বড় হচ্ছিল, ততই তার চারপাশে তৈরি হতে পারে উত্তপ্ত ও উচ্চচাপের হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল। সেই বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে পাথুরে কণাগুলো পৃথিবীর দিকে নেমে আসছিল।

গবেষকদের প্রস্তাবিত মডেল অনুযায়ী, এই পাথুরে কণার মধ্যে থাকা আয়রন অক্সাইডের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের হাইড্রোজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটতে পারে। প্রচণ্ড উত্তাপে সেই বিক্রিয়ার ফলে পানি ও ধাতব লোহা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় পানি তৈরি হলে তা পৃথিবীর প্রাথমিক পানির একটি উৎস হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপন্ন ধাতব লোহা পৃথিবীর অভ্যন্তরে জমা হয়ে তার ধাতব কেন্দ্র বা কোর গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পৃথিবীর প্রাথমিক বায়ুমণ্ডল ঠিক কতটা হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ ছিল, কত পরিমাণ পাথুরে কণা এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিল এবং উৎপন্ন পানির কতটা পৃথিবীতে টিকে ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

পরীক্ষাগারে কী পাওয়া গেছে?

গবেষকেরা তাঁদের ধারণা যাচাই করতে পরীক্ষাগারে বিভিন্ন ধরনের সিলিকেট পাথরের নমুনা ব্যবহার করেন। নমুনাগুলোকে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। এরপর সেগুলোর ওপর দিয়ে প্রবাহিত করা হয় হাইড্রোজেন গ্যাস। তুলনামূলক পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয় হিলিয়াম গ্যাসও। পরীক্ষায় দেখা যায়, হাইড্রোজেনের প্রবাহে রাখা পাথরের নমুনাগুলোর মধ্যে থাকা প্রায় ৮০ শতাংশ আয়রন অক্সাইড ধাতব লোহায় রূপান্তরিত হয়। এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পানি তৈরি হয়। অন্যদিকে, হিলিয়ামের পরিবেশে রাখা নমুনাগুলোতে একই ধরনের বিক্রিয়া ঘটেনি। গবেষকেরা মনে করছেন, এই ফলাফল তাঁদের প্রস্তাবিত রাসায়নিক প্রক্রিয়ার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক প্রমাণ। তবে পরীক্ষাগারের পরিবেশ ও পৃথিবীর জন্মলগ্নের প্রকৃত পরিবেশ এক নয়। পরীক্ষায় পাওয়া ফলাফলকে পৃথিবীর প্রাথমিক ইতিহাসে প্রয়োগ করতে হলে তাপমাত্রা, চাপ, বায়ুমণ্ডলের গঠন এবং পাথুরে কণার পরিমাণের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

শত শত মহাসাগরের সমপরিমাণ পানি?

গবেষণার সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো পৃথিবী গঠনের সময় সম্ভাব্য পানির পরিমাণের হিসাব। অধ্যাপক জাকারি শার্প ও তাঁর সহগবেষকেরা পরীক্ষাগারের ফলাফল বিশ্লেষণ করে ধারণা করছেন, পৃথিবীর প্রাথমিক গঠনের সময় এই প্রক্রিয়ায় শত শত মহাসাগরের সমপরিমাণ পানি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। অধ্যাপক শার্প জানান, গবেষকেরা পরীক্ষায় ধাতব লোহা ও পানি তৈরির আশা করেছিলেন। কিন্তু বিক্রিয়াটি কত দ্রুত ঘটবে এবং কতটা পানি তৈরি হবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে জানা ছিল না। ফলাফল থেকে করা হিসাব তাঁদেরও বিস্মিত করেছে। তবে এই হিসাবকে পৃথিবীর বর্তমান পানির পরিমাণের সরাসরি পরিমাপ হিসেবে দেখা যাবে না। এটি পরীক্ষাগারের ফলাফলকে পৃথিবীর প্রাথমিক গঠনের সম্ভাব্য পরিবেশে প্রয়োগ করে পাওয়া একটি অনুমান। এ ছাড়া উৎপন্ন পানির কতটা পৃথিবীতে টিকে ছিল, কতটা মহাকাশে হারিয়ে গিয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কতটা অন্য উৎস থেকে এসেছিল, এসব বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন। সুতরাং, গবেষণাটি পৃথিবীর পানির বিপুল সম্ভাব্য উৎসের কথা বললেও বর্তমান পৃথিবীর সব পানি এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ এখনো নেই।

ধূমকেতু ও গ্রহাণুর ভূমিকা কি বাতিল হয়ে গেল?

না। নতুন গবেষণা পৃথিবীর পানির উৎস হিসেবে ধূমকেতু, গ্রহাণু বা উল্কাপিণ্ডের ভূমিকা বাতিল করছে না। আগের গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, কিছু মহাজাগতিক পাথুরে বস্তুতে পানি বা পানির উপাদান রয়েছে। পৃথিবীর প্রাথমিক ইতিহাসে এসব বস্তু সংঘর্ষের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করে থাকতে পারে। নতুন গবেষণাটি বলছে, পৃথিবীর পানি তৈরির জন্য বাইরের মহাকাশ থেকে পানিসমৃদ্ধ বস্তু আসার পাশাপাশি পৃথিবীর নিজস্ব রাসায়নিক প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ, পৃথিবীর পানির উৎস একাধিক হতে পারে। পৃথিবী গঠনের সময় অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পানি তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে মহাকাশ থেকে আসা বিভিন্ন বস্তু থেকেও পানি পেয়েছে, এমন সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীর মোট পানির কতটা অংশ কোন উৎস থেকে এসেছে, তা নির্ধারণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

অন্য গ্রহেও কি একইভাবে পানি তৈরি হতে পারে?

এই গবেষণার গুরুত্ব পৃথিবীর অতীত বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে অন্য নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণকারী পাথুরে গ্রহগুলোর অনুসন্ধানেও। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর মতো গ্রহে পানি ও প্রাণের উপযোগী পরিবেশ খুঁজছেন। এসব গ্রহকে বলা হয় এক্সোপ্ল্যানেট। যদি অন্য পাথুরে গ্রহও পেবল অ্যাক্রিশন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়ে থাকে এবং সেখানে উপযুক্ত হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল ও লোহা-অক্সিজেনসমৃদ্ধ পাথুরে উপাদান থাকে, তাহলে একই ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পানি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। এর অর্থ, অন্য গ্রহে পানি পাওয়ার জন্য সব সময় ধূমকেতু বা বরফসমৃদ্ধ গ্রহাণুর আঘাতের প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে এটি এখনো একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। অন্য গ্রহে এই প্রক্রিয়া ঘটেছে কি না, সেখানে উৎপন্ন পানি টিকে থাকতে পেরেছে কি না, কিংবা সেই পানি তরল অবস্থায় রয়েছে কি না, এসব বিষয়ে আলাদা পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন। কোনো গ্রহে পানি থাকার সম্ভাবনা থাকলেই সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না।

পৃথিবীর পানির রহস্য কি সমাধানের পথে?

পৃথিবীর পানির উৎস নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। নতুন গবেষণাটি দেখিয়েছে, পৃথিবী গঠনের সময় তার নিজস্ব পাথুরে উপাদান ও হাইড্রোজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পানি তৈরি হওয়ার একটি কার্যকর প্রক্রিয়া থাকতে পারে। এটি পৃথিবীর পানির উৎস নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি বাতিল না করলেও নতুন একটি ব্যাখ্যার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

আজ পৃথিবীর সমুদ্র, নদী, হ্রদ ও জীবনের জন্য অপরিহার্য পানির ইতিহাস হয়তো লুকিয়ে আছে পৃথিবীর জন্মলগ্নের সেই উত্তপ্ত পরিবেশে। তবে সেই পানির কতটা অংশ পৃথিবী নিজেই তৈরি করেছে, আর কতটা এসেছে মহাকাশ থেকে, তার উত্তর পেতে বিজ্ঞানীদের আরও গবেষণা করতে হবে।##