কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#
একটি নক্ষত্র। কোনো রকেট নেই, ইঞ্জিন নেই, জ্বালানি নেই। অথচ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলেছে। পেছনে ফেলে যাচ্ছে নিজের গ্যালাক্সি—আকাশগঙ্গা। সামনে শুধু অন্ধকার মহাশূন্য। আর তার এই ভয়ংকর গতির পেছনে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছর আগের এক মহাজাগতিক বিস্ফোরণের গল্প।
নক্ষত্রটির নাম US 708। পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে, আকাশের Ursa Major বা বৃহৎ ভালুক নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে অবস্থান করছে এটি। আমাদের চোখে এটি নিছক একটি ক্ষীণ আলোকবিন্দু। কিন্তু সেই আলোকবিন্দুর গতিপথের দিকে তাকিয়েই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন এক অসাধারণ মহাজাগতিক ঘটনা, একসময় একটি ঘনিষ্ঠ দ্বৈত নক্ষত্রব্যবস্থার অংশ থাকা US 708 সম্ভবত তার সঙ্গী নক্ষত্রের ভয়াবহ তাপ-পরমাণবিক বিস্ফোরণের ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে এখন আকাশগঙ্গার মহাকর্ষীয় বন্ধন থেকে বেরিয়ে পড়ছে।
প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার, এই গতি কল্পনা করাও কঠিন। প্রতি ঘণ্টায় তা প্রায় ৪৩ লাখ কিলোমিটার। অর্থাৎ মাত্র এক ঘণ্টায় নক্ষত্রটি পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্বের বহু গুণ পথ অতিক্রম করতে পারে। আর এই গতির কারণেই US 708 জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাছে একটি বিশেষ ধরনের hypervelocity star—অত্যন্ত দ্রুতগতির নক্ষত্র।
সাধারণ নক্ষত্র নয় US 708
US 708 সূর্যের মতো স্বাভাবিক প্রধান-ক্রমের নক্ষত্র নয়। এটি একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত ও compact helium-rich subdwarf O (He-sdO) নক্ষত্র। এর বাইরের হাইড্রোজেন-সমৃদ্ধ স্তরের বড় অংশ হারিয়ে গেছে এবং বর্তমানে হিলিয়াম তার বায়ুমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই বৈশিষ্ট্যটিই বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র হয়ে ওঠে। কারণ একটি নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠন, ঘূর্ণন এবং গতিপথ অনেক সময় তার অতীত জীবনের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। US 708-এর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। নক্ষত্রটির বর্তমান গতি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা শুধু জানতে চাননি এটি কত দ্রুত চলছে; তাঁরা আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন—
এটি এত দ্রুত হলো কীভাবে? এত দ্রুত নক্ষত্রকে কে ছুড়ে দিল? প্রথমে মনে হতে পারে, এর পেছনে নিশ্চয়ই আকাশগঙ্গার কেন্দ্রের ভয়ংকর কোনো শক্তি রয়েছে। আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর Sagittarius A*। এর ভর সূর্যের চেয়ে প্রায় ৪০ লাখ গুণ। এর মহাকর্ষীয় শক্তি এত প্রবল যে এর আশপাশ দিয়ে কোনো দ্বৈত নক্ষত্রব্যবস্থা অতিক্রম করার সময় দুটি নক্ষত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় একটি নক্ষত্র কৃষ্ণগহ্বরের দিকে টেনে নেওয়া হতে পারে, আর অন্যটি বিপুল গতিতে ছিটকে যেতে পারে। একে সাধারণভাবে Hills mechanism বলা হয়। অনেক hypervelocity star-এর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। কিন্তু US 708 যেন সেই গল্প মানতে রাজি নয়। এর গতিপথ উল্টো দিকে হিসাব করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এটি আকাশগঙ্গার কেন্দ্র থেকে আসেনি। বরং এর অতীত গতিপথ এমন একটি অঞ্চলের দিকে নির্দেশ করে, যা Galactic disk-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ US 708-এর পেছনে শুধু কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বরের গল্প নেই। তাহলে?
সামনে আসে একটি বিস্ফোরিত নক্ষত্রের গল্প
গবেষকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো—US 708 একসময় একটি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ binary star system-এর সদস্য ছিল। একটি নক্ষত্র ছিল US 708। অন্যটি ছিল একটি অত্যন্ত ঘন ও ভারী white dwarf। এই দুই নক্ষত্রের দূরত্ব এত কম ছিল যে তাদের মধ্যে পদার্থের আদান-প্রদান চলতে পারত। US 708 থেকে বেরিয়ে আসা পদার্থ তার সঙ্গী white dwarf-এর ওপর জমা হতে থাকে। কিন্তু white dwarf কোনো সাধারণ নক্ষত্র নয়। এটি মূলত একটি মৃত নক্ষত্রের অত্যন্ত ঘন অবশিষ্টাংশ। তার ভেতরে পদার্থ এত বেশি ঘন অবস্থায় থাকে যে অল্প পরিমাণ অতিরিক্ত পদার্থও পরিস্থিতিকে নাটকীয়ভাবে বদলে দিতে পারে। গবেষকদের মডেল অনুযায়ী, একসময় white dwarf-এর ওপর জমা হওয়া হিলিয়াম ভয়াবহ thermonuclear explosion সৃষ্টি করতে পারে। এরপর যা ঘটেছিল, সেটিই US 708-এর বর্তমান গতির রহস্যের চাবিকাঠি। বিস্ফোরণে binary system-এর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। সঙ্গী নক্ষত্রটি ধ্বংস হয়ে যায়। আর US 708—যে নক্ষত্রটি এতদিন তার সঙ্গীকে কেন্দ্র করে ঘুরছিল, হঠাৎ নিজের পূর্বের কক্ষীয় গতিসহ ছিটকে বেরিয়ে যায়। এক অর্থে, তার সঙ্গীর মৃত্যু তাকে মহাকাশে পালানোর গতি দিয়ে যায়।
এক মহাজাগতিক ‘বেঁচে যাওয়া’ নক্ষত্র
US 708-এর গল্পের সবচেয়ে নাটকীয় দিক এখানেই। তার সঙ্গী নক্ষত্রটি আর নেই। কিন্তু US 708 বেঁচে গেছে। বিস্ফোরণের ধাক্কা পেছনে ফেলে সে এখন একা ছুটছে। গবেষণায় US 708-এর দ্রুত ঘূর্ণনের কথাও উঠে এসেছে। ঘনিষ্ঠ binary system-এর দীর্ঘস্থায়ী পারস্পরিক মহাকর্ষীয় প্রভাব তার ঘূর্ণনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। অর্থাৎ নক্ষত্রটির শরীরের মধ্যেই যেন তার পুরোনো জীবনের কিছু চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে। তার রাসায়নিক গঠন, ঘূর্ণন এবং গতিপথ—সবকিছু মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা একটি হারিয়ে যাওয়া binary system-এর ছবি পুনর্গঠন করার চেষ্টা করছেন।
প্রতি সেকেন্ডে ১,২০০ কিলোমিটার!
সংখ্যাটি আবারও মনে রাখা যাক। ১,২০০ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। এটি প্রায় ৪৩ লাখ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। এক দিনে প্রায় ১০৩ কোটি কিলোমিটার পথ। অবশ্য মহাকাশে ‘গতি’ বলার সময় কোন reference frame ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। US 708-এর ক্ষেত্রে গবেষকেরা এর গতিকে Galactic rest frame-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেই হিসাবে এর বেগ প্রায় ১,২০০ km/s পর্যায়ে পৌঁছায়। এই গতি আকাশগঙ্গার মহাকর্ষীয় বন্ধন অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট। ফলে US 708 একটি unbound star হিসেবে পরিচিত, অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে এটি আর আকাশগঙ্গার সঙ্গে মহাকর্ষীয়ভাবে আবদ্ধ থাকবে না।
তাহলে কি US 708 ইতিমধ্যে আকাশগঙ্গার বাইরে?
না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। US 708 এখনও আকাশগঙ্গার বিশাল halo অঞ্চলের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু এর গতি এত বেশি যে এটি ভবিষ্যতে আকাশগঙ্গার মহাকর্ষীয় প্রভাব অতিক্রম করে intergalactic space-এর দিকে চলে যেতে পারে। অর্থাৎ এটি এখনই গ্যালাক্সির সীমানা পেরিয়ে যায়নি। বরং আমরা এমন একটি নক্ষত্রকে দেখতে পাচ্ছি, যে একদিন নিজের গ্যালাক্সিকে পেছনে ফেলে চলে যাবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের সময়ের হিসাবে এই যাত্রা অবশ্য খুব ধীর। মানুষের জীবদ্দশায় এর অবস্থানের নাটকীয় পরিবর্তন চোখে পড়বে না। কিন্তু কোটি কোটি বছরের মহাজাগতিক সময়ের হিসাবে US 708-এর পথ একেবারেই অন্যরকম।
প্রথমে কেউ জানত না, এটি এত দ্রুত
US 708-এর ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়। নক্ষত্রটি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৮২ সালের পর্যবেক্ষণে। তখন এটি ছিল আকাশের একটি ক্ষীণ, অস্বাভাবিক নীল বস্তু, এর প্রকৃত গতির রহস্য তখনও অজানা। পরবর্তী সময়ে Sloan Digital Sky Surveyসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে এর spectrum ও গতিবিধি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। Keck Observatory-এর মতো শক্তিশালী টেলিস্কোপও এর পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অবশেষে ২০১৫ সালে Stephan Geier-এর নেতৃত্বে গবেষকদল US 708-এর গতি ও গতিপথ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করে। তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি শুধু দ্রুতগতির নক্ষত্র নয়; এটি আকাশগঙ্গার মহাকর্ষীয় বন্ধন অতিক্রম করতে সক্ষম একটি hypervelocity star। আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল এর গতিপথ। যদি এটি আকাশগঙ্গার কেন্দ্র থেকে আসত, তাহলে গল্পটি অপেক্ষাকৃত পরিচিত হতো। কিন্তু এর গতিপথ সেই ধারণার সঙ্গে মেলেনি। ফলে গবেষকদের সামনে নতুন প্রশ্ন দাঁড়ায়, আকাশগঙ্গার কেন্দ্রের কৃষ্ণগহ্বর নয়, তাহলে কে এই নক্ষত্রটিকে এত দ্রুত ছুড়ে দিল? সেখান থেকেই binary system এবং thermonuclear explosion-এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যাটি গুরুত্ব পায়।
US 708 কি একা?
সম্ভবত নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আকাশগঙ্গায় আরও অনেক দ্রুতগতির নক্ষত্র থাকতে পারে। কিন্তু সেগুলো শনাক্ত করা সহজ নয়। কারণ আমাদের গ্যালাক্সি বিশাল। এর ভেতরে অসংখ্য নক্ষত্র রয়েছে। তাদের মধ্যে কোনটি সত্যিই hypervelocity star, আর কোনটি শুধু আমাদের তুলনায় দ্রুত চলছে—তা নির্ধারণ করতে নক্ষত্রের দূরত্ব, proper motion, radial velocity এবং অন্যান্য তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হয়। ESA-এর Gaia মিশনের মতো মহাকাশ পর্যবেক্ষণ প্রকল্প এই গবেষণায় নতুন দরজা খুলেছে। কোটি কোটি নক্ষত্রের অবস্থান ও গতিবিধি নির্ণয়ের ফলে ভবিষ্যতে আরও hypervelocity star শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ US 708 হয়তো কোনো বিচ্ছিন্ন মহাজাগতিক ঘটনা নয়। এটি হয়তো এমন এক বিশাল জনসংখ্যার প্রথম দিকের সদস্য, যাদের কেউ কেউ একদিন আমাদের গ্যালাক্সি ছেড়ে বেরিয়ে যাবে।
একটি নক্ষত্রের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মহাজাগতিক ইতিহাস
US 708-এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব তার গতি নয়। এর আসল গুরুত্ব হলো—একটি নক্ষত্রের বর্তমান অবস্থান ও গতিবেগ ব্যবহার করে তার অতীতের বিস্ফোরণ পুনর্গঠন করা সম্ভব। আজ পৃথিবী থেকে আমরা যে ক্ষীণ আলোর বিন্দুটি দেখতে পাই, সেটি আসলে অতীতের একটি বার্তা বহন করছে। কোটি কোটি বছর আগে একটি binary system ছিল। দুটি নক্ষত্র ছিল। তাদের মধ্যে পদার্থের আদান-প্রদান হয়েছে। একটির ওপর পদার্থ জমেছে। তারপর ভয়াবহ thermonuclear explosion। একটি নক্ষত্র ধ্বংস হয়েছে। অন্যটি ছিটকে গেছে। আর সেই ছিটকে যাওয়া নক্ষত্রই আজ US 708 নামে মহাকাশের অন্ধকারে ছুটে চলেছে। প্রতি সেকেন্ডে ১,২০০ কিলোমিটার বেগে। তার সামনে আর কোনো নক্ষত্রের কক্ষপথ নেই, নেই কোনো পরিচিত গন্তব্য। শুধু আকাশগঙ্গার মহাকর্ষীয় বন্ধন থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হয়ে যাওয়া এক দীর্ঘ যাত্রা। একদিন হয়তো US 708 আমাদের গ্যালাক্সির সীমানা পেরিয়ে আন্তঃছায়াপথীয় মহাশূন্যে চলে যাবে। তখন তার পেছনে পড়ে থাকবে সেই আকাশগঙ্গা—যেখানে তার জন্ম, তার সঙ্গীর মৃত্যু এবং তার নিজের পালিয়ে যাওয়ার গল্প।
একটি নক্ষত্রের এই পালিয়ে যাওয়া তাই শুধু মহাকাশের এক বিস্ময়কর দৃশ্য নয়; এটি একটি হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র-জুটির শেষ অধ্যায়ের জীবন্ত প্রমাণ।#

