-- বিজ্ঞাপন ---

সময় ভ্রমণ: আধুনিক বিজ্ঞান ও কোরআনের আলোকে সময়ের বিস্ময়কর ধারণা!

সিরাজুর রহমান#

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে সময় ভ্রমণ বা টাইম ট্রাভেলের ধারণা নতুনভাবে আলোচনায় আসে। বিশেষত বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশের পর বিজ্ঞানীরা উপলব্ধি করেন, সময় কোনো স্থির মাত্রা নয়, বরং গতি, মহাকর্ষ এবং মহাবিশ্বের শক্তি ক্ষেত্রের ওপর সময়ের প্রবাহ ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে।
এর পর থেকে বিজ্ঞানীরা নিয়মিতভাবে সময় ভ্রমণ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তা এখনো পর্যন্ত এটি একটি আকর্ষণীয় তাত্ত্বিক ধারণা হিসেবে হিসেবে রয়ে গেছে। যদিও এর বাস্তব প্রয়োগ বা প্রযুক্তিগতভাবে সময় ভ্রমণের উপযোগী কোনো ব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত তৈরি বা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। যদিও গত এক শতাব্দীতে টাইম ট্রাভেলকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শতাধিক রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মতে, সময় ভ্রমণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো ‘টাইম ডিলেশন’। অর্থাৎ, খুব বেশি গতি বা শক্তিশালী মহাকর্ষীয় অঞ্চলে সময় ধীরগতিতে অতিক্রান্ত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যদি কোনো মহাকাশযান আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করতে পারে, তবে সেই নভোচারীরা পৃথিবীতে ফিরে এসে মনে করবেন তাদের হয়ত মাত্র কয়েক বছর কেটেছে, কিন্তু পৃথিবীতে কেটে গেছে হয়ত কয়েক শতাব্দী। এভাবে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতের দিকে সময় ভ্রমণের সম্ভাবনাকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করেন।
তবে, সময় ভ্রমণের এই ধারণাকে প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবায়ন করা এখনো মানবজাতির সাধ্যের বাইরে রয়ে গেছে। বিশেষ করে আলোর গতি অর্জন করা বা তার নিকটবর্তী হওয়া একটি বিশাল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে মহাকাশে জীবিত রাখা, খাদ্য-জ্বালানি এবং জীবনরক্ষার মতো ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, কসমিক রেডিয়েশন থেকে সুরক্ষা দেওয়া, এসবই কিন্তু মানবজাতির বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বাইরে রয়ে গেছে।
বিজ্ঞান যেখানে সময়কে গতি ও মহাকর্ষের সাথে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করছে, সেখানে ইতিহাস ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থে সময়-সম্পর্কিত কিছু অসাধারণ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সময় ভ্রমণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি চমৎকার ঘটনা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছ, যা প্রায় ১৪ শতাব্দী আগেই মহান সৃষ্টিকর্তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন।
পবিত্র কোরআনে, সূরা কাহাফে, “আসহাবে কাহাফ”, অর্থাৎ একদল সম্মানিত যুবকের প্রায় তিন শতাব্দীব্যাপী বা দীর্ঘকাল নিদ্রায় থাকার অলৌকিক কাহিনির সাথে আধুনিক টাইম ট্রাভেল বা সময় ভ্রমণের এক আশ্চর্যজনক মিল বা সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। বিশেষ করে, ধর্মীয় ঘটনা ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ভিন্ন কাঠামোতে উপস্থাপিত হলেও, সময়-অনুভূতির বৈচিত্র্য আলোচনা করতে গেলে দুই ধারণার মাঝে কিন্তু আকর্ষণীয় মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
আসলে পবিত্র কোরআনে ১৮ নং সূরা কাহাফ এর ৯-২৬ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, তৎকালীন সময়ে কয়েকজন সম্মানিত যুবক তাদের ইমান রক্ষার উদ্দেশ্যে একটি গুহায় আশ্রয় নেন এবং আল্লাহর আদেশে একটানা প্রায় ৩০৯ বছর পর্যন্ত নিদ্রিত অবস্থায় থাকেন। পরবর্তীতে জাগ্রত হওয়ার পর তাদের মনে হয়েছিল, তারা যেন মাত্র একদিন বা তারও কম সময় পর্যন্ত ঘুমিয়ে ছিলেন। অথচ, এরই মধ্যে তারা বাস্তবে প্রায় তিন শতাব্দী বছর সময় অতিক্রম করে ফেলেন। আর সময়ের এই বিশাল পার্থক্য কোরআনে একটি অলৌকিক ঘটনা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে এবং মুসলিম বিশ্বে এটি বিশ্বাসের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
অন্যদিকে, আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সময় ভিন্নভাবে অতিক্রম হওয়ার ধারণা ‘টাইম ডিলেশন’-এর সাথে এক ধারণাগত সাদৃশ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ মানুষের জন্য সময়ের প্রবাহ ভিন্ন হতে পারে, এ ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবেও আলোচিত। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোরআনে বর্ণিত আসহাবে কাহাফের ঘটনা ধর্মীয় অলৌকিকতা এবং মহান আল্লাহর এক আশ্চর্যজনক নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, বিজ্ঞান সময় ভ্রমণকে পদার্থ বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে।
উপসংহারে বলা যায়, সময় ভ্রমণ নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আর কোরআনে বর্ণিত ঘটনা মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের সমন্বয়ে সময় ভ্রমণের রহস্যকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। বিজ্ঞান তার নিজস্ব তত্ত্ব নিয়ে এগিয়ে যায়, আর ধর্মীয় বিশ্বাস তার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় সৌরভ ছড়ায়। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি পরস্পরকে বিরোধিতা করে না, বরং সৃষ্টিকর্তার মহা কুদরতের সামনে মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে আমাদের সাহায্য করে।#