কাজী আবুল মনসুর#
প্রাচীন মিসরের মানুষ এখনও পুরানো অনেক ধ্যান-ধারণা মাথায় রেখে পথ চলেন। বিশেষ করে পিরামিড নিয়ে তরুণ মিসরীয়দের মনে কৌতূহলের শেষ নেই। প্রাচীন মিসরীয়দের প্রধান বিশ্বাসই ছিল—মৃত্যুর পর মানুষের আরেকটি জীবন শুরু হয়, যাকে তারা বলত ‘পরকাল’। তাদের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পরও মানুষের আত্মা বেঁচে থাকে। আর এই আত্মাকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা শরীরকে পচন থেকে রক্ষা করতে ‘মমি’ তৈরি করত।
শুধু শরীর রক্ষা করলেই হতো না, তাদের বিশ্বাস ছিল আত্মার থাকার জন্য একটি নিরাপদ ঘরের প্রয়োজন। আর সেই ভাবনারই ফসল হলো মিসরের বিশাল সব পিরামিড। তারা বিশ্বাস করত, পরলোকেও আত্মার খাবারের প্রয়োজন, তাই মমির সাথে খাবার, পানীয়, দামি পোশাক, এমনকি সুগন্ধিও দিয়ে দেওয়া হতো। প্রভাবশালী রাজা বা ‘ফেরাউন’ মারা গেলে তো কথাই নেই, তার পরকালের বিলাসের জন্য সোনা-দানা, হীরা-জহরত, আসবাবপত্র, এমনকি তার প্রিয় দাস-দাসীদের প্রতিকৃতিও কবরে দিয়ে দেওয়া হতো।
ফেরাউন: কোনো নাম নয়, একটি রাজকীয় উপাধি
অনেকে মনে করেন ‘ফেরাউন’ বুঝি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম। আসলে তা নয়। ‘ফেরাউন’ বা ‘ফারাও’ (Pharaoh) হলো প্রাচীন মিসরের রাজাদের একটি রাষ্ট্রীয় উপাধি বা খেতাব, যার অর্থ ‘ can ‘বিশাল প্রাসাদ’ বা ‘রাজকীয় গৃহ’। প্রাচীন মিসরে যারা রাজ্য শাসন করতেন, তাদের সবাইকে ফেরাউন বলা হতো। পবিত্র কুরআনে হযরত মুসা (আঃ)-এর আমলে যে ফেরাউনের উল্লেখ আছে, ইতিহাসবিদদের মতে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় রামসিস (Ramses II) অথবা তার পুত্র মেরনেপতাহ (Merneptah)।
লোকমুখে প্রচলিত আছে যে ফেরাউনরা ৪০০/৫০০ বছর বেঁচে থাকতেন, তবে আধুনিক ইতিহাস ও বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা অনুযায়ী তাদের গড় আয়ু সাধারণ মানুষের মতোই ছিল। তবে দ্বিতীয় রামসিসের মতো কিছু ফেরাউন প্রায় ৯০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ জীবন শাসন করেছিলেন, যা সেই আমলের তুলনায় ছিল অবিশ্বাস্য।
পিরামিড: পাথর ও গণিতের এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়
মিসরের পিরামিডগুলো আসলে ফেরাউন বা প্রাচীন মিসরীয় অভিজাতদের সমাধিস্তম্ভ। মিসরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় একশরও বেশি পিরামিড আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় হলো গীজার গ্রেট পিরামিড, যা রাজা খুফু-র জন্য নির্মিত হয়েছিল।
এই পিরামিড সম্পর্কে কিছু রোমাঞ্চকর তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
বিশালতা ও উচ্চতা: মূল নির্মাণের সময় এর উচ্চতা ছিল প্রায় ৪৮১ ফুট (বর্তমানে ক্ষয়ের কারণে তা প্রায় ৪৫৫ ফুট)। এটি প্রায় ১৩ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
পাথরের ওজন: পিরামিডটি তৈরিতে প্রায় ২৩ লক্ষ পাথরের ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কিছু গ্রানাইট পাথরের ওজন ছিল ২৫ থেকে ৭০ টন পর্যন্ত!
নির্মাণশৈলী: কোনো আধুনিক ক্রেন বা রড-সিমেন্ট ছাড়া, কেবল জ্যামিতিক নিখুঁত পরিমাপের মাধ্যমে পাথর একটার ওপর আরেকটা বসিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। দুই পাথরের জোড়াতালির মাঝে বিন্দুমাত্র ফাঁক নেই, এমনকি একটি পাতলা ব্লেডও সেখানে প্রবেশ করানো সম্ভব নয়।
দিক নির্ণয়: গীজার পিরামিডের চারদিকের কোণগুলো একদম নিখুঁতভাবে পৃথিবীর উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিক নির্দেশ করে, যা আধুনিক বিজ্ঞানীদেরও চমকে দেয়।
শ্রমিকদের রহস্য: একসময় ভাবা হতো দাসদের জোর করে খাটিয়ে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় জানা গেছে, প্রায় ১ লক্ষ দক্ষ ও বেতনভুক্ত স্বাধীন শ্রমিক স্বেচ্ছায় এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তাদের রাজার জন্য এই পিরামিড তৈরিতে অংশ নিয়েছিলেন।
বহুদূর থেকে এই বিশাল পাথরখণ্ডগুলো নীলনদ দিয়ে নৌকায় করে এবং মরুভূমিতে কাঠের চাকা ও রশির সাহায্যে টেনে এনে জোড়া লাগানো হতো। এই পাথুরে নির্মাণশৈলী আজও মানুষের মনে নানা রহস্যের জন্ম দেয়। হাজার বছর পার হয়ে গেলেও প্রাচীন মিসরীয়দের এই অমর কীর্তি এবং তাদের পরকাল সংক্রান্ত বিশ্বাস আজও পুরো বিশ্বকে সমানভাবে মুগ্ধ করে চলেছে।
পিরামিড কি শুধু মিসরেই আছে
না, পৃথিবীর আরও অনেক দেশে আছে। আসলে সংখ্যার দিক থেকে বিচার করলে মিসরের চেয়েও বেশি পিরামিড রয়েছে অন্য দেশে।
সুদান (সবচেয়ে বেশি পিরামিড): মিসরের প্রতিবেশী দেশ সুদানে পিরামিডের সংখ্যা মিসরের চেয়েও বেশি। প্রাচীন কুশ রাজ্যের রাজারা এখানে প্রায় ২২০টিরও বেশি পিরামিড তৈরি করেছিলেন। তবে এগুলো আকৃতিতে মিসরের পিরামিডের চেয়ে কিছুটা ছোট এবং কোণগুলো বেশি খাড়া।
মেক্সিকো: মেক্সিকোসহ মধ্য আমেরিকার মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষরা প্রচুর পিরামিড তৈরি করেছিল। মেক্সিকোর ‘চিচেন ইতজা’ (Chichen Itza) এবং ‘টিওটিহুয়াকান’ (Teotihuacan)-এর পিরামিডগুলো বিশ্ববিখ্যাত। আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পিরামিডটি কিন্তু মিসরে নয়, সেটি রয়েছে মেক্সিকোর চোলুলা-তে (Great Pyramid of Cholula)।
রোম (ইতালি): ইউরোপের দেশ ইতালির রোম শহরে ‘সেসটিয়াসের পিরামিড’ (Pyramid of Cestius) নামে একটি প্রাচীন পিরামিড রয়েছে, যা প্রায় ২০০০ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল।
চীন: চীনের শানসি প্রদেশে বেশ কিছু প্রাচীন সমাধি ঢিবি রয়েছে, যেগুলোকে ‘চাইনিজ পিরামিড’ বলা হয়। এগুলো মাটির তৈরি এবং দূর থেকে দেখতে পাহাড়ের মতো মনে হয়।
অন্যান্য দেশ: এছাড়া পেরু, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এবং ইরাকেও (যাদের জিল্কুরাত বা জিস্কুরাত বলা হয়) পিরামিড আকৃতির প্রাচীন ধর্মীয় বা রাজকীয় স্থাপনা রয়েছে।
তবে প্রাচীনত্ব, নিখুঁত জ্যামিতিক কারিগরি এবং মমি সংরক্ষণের রহস্যের কারণে মিসরের পিরামিডগুলোই বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
ফেরাউনের সংখ্যা কতো
প্রাচীন মিসরের প্রায় ৩,০০০ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে মোট ফেরাউনের (বা ফারাও) সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করে বলা কিছুটা কঠিন, কারণ অনেক রাজার নাম ইতিহাসে অস্পষ্ট রয়ে গেছে বা সময়ের সাথে হারিয়ে গেছে। তবে ইতিহাসবিদ ও মিসরতত্ত্ববিদদের (Egyptologists) অধিকাংশের মতে, প্রাচীন মিসরে আনুমানিক ১৭০ জন থেকে শুরু করে প্রায় ৩০০ জন পর্যন্ত ফেরাউন রাজ্য শাসন করেছিলেন।
এই সংখ্যাটি সুনির্দিষ্ট না হওয়ার পেছনের কারণ এবং কিছু আকর্ষণীয় তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
স্বীকৃত সংখ্যা: ঐতিহাসিকভাবে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে এমন ফেরাউনের সংখ্যা প্রায় ১৭০ জন। এর মধ্যে প্রায় ১৬৩ জন পুরুষ এবং অন্তত ৭ জন নারী ফেরাউন (যেমন: হাটশেপসুট, ক্লিওপেট্রা) ছিলেন।
রাজবংশের সংখ্যা: প্রথম ফেরাউন ‘নারমার’ (বা মেনেস) থেকে শুরু করে শেষ ফেরাউন ‘সপ্তম ক্লিওপেট্রা’ পর্যন্ত প্রায় ৩,০৮০ বছরে মিসরে মোট ৩০টি প্রধান রাজবংশ (Dynasties) শাসন করেছিল।
সংখ্যার ভিন্নতার কারণ: মিসরের ইতিহাসের কিছু মধ্যবর্তী সময়ে (Intermediate Periods) একযোগে একাধিক রাজা বা ছোট ছোট অঞ্চলের শাসকরা নিজেদের ‘ফেরাউন’ দাবি করতেন। আবার অনেক রাজার নাম প্রাচীন নথিতে থাকলেও প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো প্রমাণ মেলেনি। এই বিতর্কিত বা আঞ্চলিক শাসকদের হিসাব ধরলে মোট সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মিসরের পিরামিড কের এত জনপ্রিয়
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিসরে পর্যটকদের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৫ সালে পুরো মিসরে রেকর্ডসংখ্যক প্রায় ১ কোটি ৯০ লক্ষ (১৯ মিলিয়ন) আন্তর্জাতিক পর্যটক ঘুরতে এসেছেন। ২০২৬ সালের শুরুর দিকেও এই সংখ্যায় প্রায় ৭% প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
শুধু পিরামিড দর্শন: মিসরে আসা পর্যটকদের প্রায় সবারই মূল আকর্ষণ থাকে পিরামিড। তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষ সরাসরি গিজার পিরামিড এলাকা ভ্রমণ করেন। এদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক বিদেশি পর্যটকের পাশাপাশি মিসরের স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন।
জনপ্রিয়তা বাড়ার কারণ:
২০২৫ সালের শেষের দিকে (১ নভেম্বর) পিরামিডের ঠিক পাশেই উদ্বোধন করা হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর ‘গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম’ (GEM)। এই মেগা প্রজেক্টটি চালু হওয়ার পর থেকে পিরামিড অঞ্চলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাছাড়া পিরামিড প্রাঙ্গণকে পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক করার জন্য মিসর সরকার বড় ধরনের সংস্কার কাজও সম্পন্ন করেছে।##

