কাজী আবুল মনসুর#
ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রোববার বিকেলে ভারতের একটি বিশেষ বিমান অবতরণ করে। বিমান থেকে নামা চার সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যাঁর পরিচয় সাধারণ কূটনীতিকের মতো নয়। তিনি ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন।
বাংলাদেশে তাঁর এই সফরটি এমন এক সময়ে, যখন ঢাকা ও নয়াদিল্লি দুই দেশই দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সফরটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। বাংলাদেশের একটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশি পক্ষের আমন্ত্রণেই চার সদস্যের এই উচ্চপর্যায়ের ভারতীয় প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশই সফরটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
পরাগ জৈনের সঙ্গে রয়েছেন অশ্বিন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবল রায় চৌধুরী। ঢাকায় অবস্থানের সময় তাঁরা একটি হোটেলে থাকবেন বলে জানা গেছে। আরও একটি তথ্য এই সফরকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে. বাংলাদেশে আসার আগে পরাগ জৈন চীন সফর করেছিলেন।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের সবচেয়ে গোপনীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান কেন এখন ঢাকায়?
পরাগ জৈন, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা?
পরাগ জৈন কোনো সাধারণ আমলা নন। ১৯৮৯ ব্যাচের পাঞ্জাব ক্যাডারের এই আইপিএস কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ভারতের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৫ সালের ১ জুলাই তিনি ‘র’-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে তিনি সংস্থাটির এভিয়েশন রিসার্চ সেন্টারের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
জৈনের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাকিস্তান ও কাশ্মীর বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তিনি ‘র’-এর পাকিস্তান-সংক্রান্ত দায়িত্বে কাজ করেছেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। কাশ্মীরেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল। শ্রীলঙ্কা ও কানাডাতেও তিনি কাজ করেছেন। কানাডায় থাকাকালে খালিস্তানপন্থী নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণের দায়িত্বের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে।
২০২৫ সালের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ক্ষেত্রেও তাঁর গোয়েন্দা ভূমিকার কথা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে উঠে আসে। ফলে তাঁকে এমন একজন কর্মকর্তা হিসেবে দেখা হয়, যিনি মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এই তিনটি ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে বহন করেন।
এমন একজন কর্মকর্তার ঢাকা সফর তাই নিছক সৌজন্য সফর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
ছয় মাস আগেই শুরু হয়েছিল যোগাযোগ
পরাগ জৈনের ঢাকায় আসার ঘটনাটি হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি। এর কয়েক মাস আগে দুই দেশের গোয়েন্দা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের সূত্র তৈরি হয়েছিল। ২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশীদ চৌধুরী নয়াদিল্লি সফর করেন। সেখানে তিনি পরাগ জৈন এবং ভারতের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন। সফরটি প্রকাশ্যে ব্যাপক প্রচার পায়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের শীতলতার পর নিরাপত্তা পর্যায়ে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা। এমনকি দুই পক্ষের মধ্যে একটি বোঝাপড়ার কথাও বলা হয়—কোনো দেশই যেন তার ভূখণ্ড এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য ব্যবহার করতে না দেয়, যাদের কর্মকাণ্ড অন্য দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়।
অর্থাৎ মার্চে দিল্লিতে বাংলাদেশের গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে পরাগ জৈনের বৈঠক এবং আগস্টে পরাগ জৈনের ঢাকায় আসা—দুটি ঘটনাকে একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এবার কি আলোচনা হবে?
ঢাকায় পরাগ জৈনের সফরের আলোচ্যসূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আর সেটিই স্বাভাবিক। ‘র’-এর মতো সংস্থার প্রধান কোনো দেশে সফরে গিয়ে কী আলোচনা করলেন, তার বিস্তারিত সাধারণত প্রকাশ্যে আসে না। তবে আঞ্চলিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে কয়েকটি বিষয় সম্ভাব্য আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে। প্রথমত, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। দ্বিতীয়ত, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার প্রশ্ন। চতুর্থত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা। আর পঞ্চমত, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চীন-পাকিস্তান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান।
তাছাড়া ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নটি গত কয়েক মাস ধরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর ইস্যু। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা নিজেও সম্প্রতি বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের ঢাকায় উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করছে—শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে কোনো নতুন সমঝোতার পথ খোঁজা হচ্ছে কি না।
বিশেষ করে পরাগ জৈন বাংলাদেশে আসার আগে চীন সফর করেছেন,এই তথ্যটি আলাদা করে নজর কাড়ছে। এর অর্থ এই নয় যে তাঁর চীন সফর এবং ঢাকা সফরের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে। এমন দাবি করার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। কিন্তু ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ, চীন ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এখন যে পরস্পর সংযুক্ত বিষয়,তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ঢাকাকে ঘিরে দিল্লির নতুন হিসাব?
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা চলছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নিরাপত্তা পর্যায়েও যোগাযোগ পুনরায় শুরু হয়েছে। মার্চের ডিজিএফআই প্রধানের দিল্লি সফর ছিল তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। এখন সেই ধারাবাহিকতায় ‘র’ প্রধানের ঢাকায় আসা আরও বড় সংকেত।
কারণ কূটনীতিকরা যখন সম্পর্কের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তখন অনেক সময় সেই সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গাগুলো নিয়ে কথা বলে। রাষ্ট্রের প্রকাশ্য নীতির বাইরে কোন বিষয়গুলো দুই দেশের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ—সেগুলো নিয়েই গোয়েন্দা পর্যায়ের যোগাযোগ বেশি কার্যকর। পরাগ জৈনের সফর সেই অর্থে একটি ব্যাক-চ্যানেল নিরাপত্তা সংলাপের ইঙ্গিত হতে পারে।
কিন্তু এটিকে কি ‘গোপন অভিযান’ বলা যাবে?
না। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য থেকে এমন কোনো দাবি করার সুযোগ নেই যে পরাগ জৈন ঢাকায় কোনো গোপন অভিযান পরিচালনা করতে এসেছেন। বরং পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এটি বাংলাদেশি পক্ষের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি সফর। তবে সফরটির গোপনীয়তা এবং প্রতিনিধিদলের গঠন এটিকে সাধারণ কূটনৈতিক সফর থেকে আলাদা করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বা কোনো মন্ত্রীর সফর হলে তার রাজনৈতিক বার্তা প্রকাশ্য। কিন্তু ‘র’-এর প্রধান যখন ঢাকায় আসেন, তখন আলোচনার অনেকটাই প্রকাশের বাইরে থাকার সম্ভাবনা থাকে। এ কারণেই পরাগ জৈনের সফরকে শুধু একজন ভারতীয় কর্মকর্তার ঢাকা সফর হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটির গুরুত্ব ধরা পড়বে না।
সামনে কী?
পরাগ জৈনের ঢাকা সফরের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই—দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে নয়, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা পর্যায়েও পুনর্গঠিত হচ্ছে। মার্চে ঢাকার গোয়েন্দা প্রধান দিল্লিতে গিয়েছিলেন। আগস্টে দিল্লির গোয়েন্দা প্রধান ঢাকায় এলেন।
দুই সফরের মাঝখানে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গেও সামরিক ও নিরাপত্তা যোগাযোগ বাড়িয়েছে। ফলে নয়াদিল্লির চোখে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ভারত একই সঙ্গে চীনকে ঘিরে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা, পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা উত্তেজনা এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিবর্তিত ভূরাজনীতির মুখোমুখি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ঢাকার কোনো হোটেলে বসে পরাগ জৈন ঠিক কী নিয়ে আলোচনা করছেন, তা হয়তো প্রকাশ্যে জানা যাবে না।
কিন্তু তাঁর সফর একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের বরফ গলানোর প্রক্রিয়া এখন শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলে গেছে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার টেবিলেও। আর সেখানে বসে থাকা মানুষটির নাম, পরাগ জৈন। ভারতের ‘র’-এর প্রধান।##

