-- বিজ্ঞাপন ---

সৌরজগতের বাইরে নতুন গ্রহের সন্ধান: এক্সো-প্ল্যানেট আবিষ্কারে মানবজাতির নতুন যুগ

সিরাজুর রহমান#

আমাদের সোলার সিস্টেমের বাইরে নতুন কোনো গ্রহ খুঁজে পাওয়ার ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন একটি বিষয়। মাত্র তিন দশক আগে, ১৯৯৫ সালে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথমবার সৌরজগতের বাইরে একটি গ্রহের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন—যা মানব মহাকাশ গবেষণায় এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এক্সো-প্ল্যানেট বা বহিঃসৌরগ্রহ বলতে বোঝায় আমাদের সৌরজগতের বাইরে অন্য কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তনরত গ্রহ। যেহেতু এই গ্রহগুলোর নিজস্ব কোনো আলো নেই, তাই সরাসরি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। তবে আধুনিক টেলিস্কোপ এবং উচ্চপ্রযুক্তির সেন্সরের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা আজ এই অদৃশ্য গ্রহগুলোকেও সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রথম আবিষ্কৃত এক্সো-প্ল্যানেটটির নাম ছিল ৫১ পেগাসি বি (51 Pegasi b)। বৃহস্পতির তুলনায় কিছুটা ছোট এই গ্যাস জায়ান্টটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এটি বৃহস্পতির ভরের প্রায় ০.৪৬ গুণ এবং আমাদের সূর্যের মতো এক নক্ষত্রকে মাত্র ৪.২ দিনে প্রদক্ষিণ করে। এই আবিষ্কারই বহিঃসৌরগ্রহ অনুসন্ধানের এক নতুন যুগের সূচনা করে।

পরবর্তীতে, ২০১৫ সালে কেপলার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন আরেকটি চমকপ্রদ গ্রহ—কেপলার কে২-১৮বি (Kepler K2-18b)। পৃথিবী থেকে প্রায় ১২৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই গ্রহটি ২০১৯ সালে আলোচনায় আসে, যখন বিজ্ঞানীরা এর বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতির ইঙ্গিত পান। আর ২০২৩ সালে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) এর সাহায্যে এই গ্রহের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও মিথেন শনাক্ত হলে জ্যোতির্বিজ্ঞান মহলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়।

এই আবিষ্কারগুলো কেবল প্রযুক্তিগত সফলতা নয়, বরং মানব সভ্যতার মহাবিশ্ব অনুসন্ধানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বর্তমানে নাসা (NASA)-র তথ্যানুসারে, আমাদের সৌরজগতের বাইরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬,০০০ এক্সো-প্ল্যানেট নথিভুক্ত হয়েছে।

তবে আমাদের পরিচিত আকাশগঙ্গা গ্যালাক্সির বিশালতার তুলনায় এই সংখ্যা এখনো সামান্য। প্রায় ১ লক্ষ আলোকবর্ষ ব্যাসের এই গ্যালাক্সিতে রয়েছে আনুমানিক ১০০ থেকে ২০০ বিলিয়ন নক্ষত্র, আর সম্ভাব্য গ্রহের সংখ্যা কয়েক ট্রিলিয়ন। সেই তুলনায় আবিষ্কৃত ৬,০০০ গ্রহ মহাবিশ্বের মোট সংখ্যার মাত্র ০.০০১% এরও কম।

পরিশেষে বলা যায়, গত তিন দশকে বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টায় এই হাজারো বহিঃসৌরগ্রহের সন্ধান আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার কৌতূহল আরও গভীর করেছে। হয়তো আজই আমরা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছি না, কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো একদিন মানবজাতি হয়তো এই অজানা এক্সো-প্ল্যানেটগুলোর একটিতে এলিয়েন জীবনের অস্তিত্বের খোঁজ পাবে — যা হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কার।##