-- বিজ্ঞাপন ---

ইসরায়েলের লং-রেঞ্জ Arrow-3 মিসাইল প্রতিরক্ষা সিস্টেম জার্মানির হাতে হস্তান্তর

সিরাজুর রহমান#

জার্মানিতে আনুষ্ঠানিকভাবে Arrow 3 সিস্টেমের প্রথম ইউনিটের হস্তান্তর ও মোতায়েনে উদ্বোধন করা হয়েছে। এই সিস্টেম পেয়েছে Israel Aerospace Industries (IAI) — যা পৃথিবীর একাধিক স্তরের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ। Arrow 3 “exo-atmospheric” অর্থাৎ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরেও কাজ করতে সক্ষম; এটি উচ্চ-উড়ানের (উচ্চতর) ব্যালিস্টিক ও দীর্ঘ-দৈর্ঘ্য মিসাইল সনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে। জার্মানি এই সিস্টেম নিয়েছে মূলত বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সারা ইউরোপে মিসাইল হুমকির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য। Arrow 3-কে বলা হচ্ছে জার্মানির প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কে “উচ্চ-স্তরের” ঢাল। অর্থাৎ, স্বল্প বা মধ্য-রেঞ্জের হুমকির তুলনায় আরও বড়, দীর্ঘ-দৈর্ঘ্য ও উচ্চ-উড়ানের বিস্তৃত হুমকি মোকাবেলার জন্য। এটি ব্যবহার শুরু হওয়া মানে — শুধুমাত্র জার্মানি নয়, সম্ভাব্যভাবে পুরো ইউরোপীয় মহাদেশের জন্য একটি “নতুন প্রতিরক্ষা স্তর” সক্রিয় হয়েছে। জার্মানি ও Holzdorf Air Base (বার্লিনের দক্ষিণে অবস্থিত)-এ ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে Arrow 3 এর ক্রয়-চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তির পরের বছরগুলোর মধ্যে $৩.৫-৪.০ বিলিয়ন (ইউরোর হিসাবে ≈ €৩.৬-৪.০ বিলিয়ন) মূল্যে প্রক্রিয়া শুরু হয়। এটি ছিল ইস্রায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রফতানি চুক্তি। Arrow 3 ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন হুমকি, ব্যালিস্টিক মিসাইল ও রকেট হামলার প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়ে “combat-proven” হিসেবে পরিচিত। জার্মানির জন্য এটি একটি নতুন ক্যালিবার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা।

বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) ইসরায়েল তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি অত্যাধুনিক দীর্ঘ-পাল্লার অ্যারো–৩ (Arrow 3) এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম আনুষ্ঠানিকভাবে জার্মান বিমান বাহিনীর হাতে হস্তান্তর করেছে। মূলত বার্লিনের দক্ষিণে অবস্থিত একটি জার্মান এয়ারবেসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। গত ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানি সরকার ৪ বিলিয়ন ইউরো (৪.৬ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের এই অ্যারো–৩ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ক্রয়ের চূড়ান্ত চুক্তি করে। যদিও ঠিক কয়টি ইউনিট ক্রয় করা হচ্ছে তা সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়নি। বর্তমানে, ইসরায়েল এবং আমেরিকার সামরিক বাহিনীর পর, ইউরোপের একমাত্র দেশ হিসেবে জার্মানির বিমান বাহিনী এই লং রেঞ্জের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম অপারেট করতে যাচ্ছে।
আসলে, ইসরাইলের তৈরি অ্যারো–৩ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে মূলত মহাকাশভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের বা একটি এক্সো-অ্যাটমসফেরিক ইন্টারসেপ্টর ডিফেন্স সিস্টেমের হিসেবে ডিজাইন ও তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র অনুযায়ী, এই ডিফেন্স সিস্টেমের অপারেশনাল রেঞ্জ হতে পারে প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। তবে ইসরাইলের তরফে এর রেঞ্জ নিয়ে এখনো পর্যন্ত সঠিক তথ্য উপাত্ত প্রকাশ করা হয়নি।
এই ডিফেন্স সিস্টেমের ইন্টারসেপ্টর মিসাইলকে ২,৪০০ দূরত্বে শত্রুপক্ষের ব্যালেস্টিক ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল কার্যকরভাবে শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়। জার্মানির প্রতিরক্ষা স্থাপনায় এই সিস্টেম যুক্ত হওয়ায় দেশটির দূরপাল্লার হুমকি মোকাবিলার ক্ষমতা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বলে মনে করা হয়।
এই জাতীয় ডেডিকেটেড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম জার্মানিতে মোতায়েন ইসরাইলের সামরিক ও সক্ষমতার একটি মাইলফলক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এটি প্রথমবারের মতো ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কোনো দেশে সম্পূর্ণরূপে কার্যকর এবং স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে।
এর পাশাপাশি মাত্র ৯১ লক্ষ জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ইসরায়েলের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি বিভিন্ন মডেল ও রেঞ্জের আয়রন ডোম, ডেভিড স্লিং এবং অতি সাম্প্রতিক সময়ে অ্যারো–৩ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বিশ্বের সামনে উন্মোচন করেছে। তবে, কয়েক মাস আগে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের ভয়াবহ যুদ্ধে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের অপারগতা এবং সীমাবদ্ধতা বিশ্বের নজর কিন্তু এড়িয়ে যায়নি।
বিশেষ করে ইসরাইল; কিন্তু আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের সহায়তায় ব্যাপক মাত্রায় ইরানের উপর এয়ার স্ট্রাইক শুরু করলেও, প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার দূর থেকে ইরানের পালটা শক্ত প্রতিরোধ এবং মিসাইল হামলায় বড়ো ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইসরাইল। তাই এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, পৃথিবীর কোনো এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমই এখনো পর্যন্ত শতভাগ সুরক্ষা দেওয়ার মতো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জন করতে পারেনি।
বিশেষ করে যুদ্ধের শেষের দিকে ইরানের শক্তিশালী হাইপারসনিক গতির ব্যালেস্টিক মিসাইলগুলো আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ইসরাইল এবং আরব দেশগুলোর মোট ৪ থেকে ৫ স্তরের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে যেভাবে ব্যাপক মাত্রায় হামলা চালাতে শুরু করেছিল, তা দেখে সারা বিশ্ব হতবাক হয়ে যায়।
তাই পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বের অন্যতম উন্নত এবং বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোও সাম্প্রতিক সংঘর্ষে হাইপারসনিক গতির মিসাইল প্রতিহত করতে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে হাইপারসনিক হুমকির বিরুদ্ধে আরও উন্নত প্রযুক্তি ও সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।##