সরকার নাহিদ, নিউইয়র্ক#
নিউইয়র্ক সিটি—যে শহর কখনো ঘুমায় না, আজ সেই শহর জেগে আছে নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। উগান্ডায় জন্ম নেওয়া, ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক তরুণ মুসলিম রাজনীতিক, যিনি একসময় ট্যাক্সি চালিয়ে পড়াশোনা করতেন, এখন সেই শহরের মেয়র। তার নাম জোহরান কওমে মামদানী (Zohran Kwame Mamdani)। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তিনি জয় করেছেন বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর নগরের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ।
শৈশব থেকে সংগ্রাম, উগান্ডা থেকে নিউইয়র্ক। ১৯৯১ সালে উগান্ডার কাম্পালায় জন্ম জোহরানের। বাবা মাহমুদ মামদানী একজন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী, আর মা মীরা নায়ার বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক (‘Monsoon Wedding’, ‘Salaam Bombay’)।
শৈশবে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। বড় হয়েছেন নিউইয়র্কের কুইন্স জেলায়—যেখানে বাংলাদেশি, ভারতীয়, লাতিনো, আফ্রিকান, ইহুদি—সব সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে। স্কুলজীবনে তিনি দেখেছেন অভিবাসী শ্রমিকদের কষ্ট, দেখেছেন ট্যাক্সি ড্রাইভারদের অবহেলা, দেখেছেন একঘেয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের উপেক্ষা।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় তার বিশ্বাস—“রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়, এটি মানুষের জন্য কাজ করার দায়িত্ব।”
Bowdoin College থেকে আফ্রিকান স্টাডিজে স্নাতক শেষ করার পর তিনি জীবন চালাতে ট্যাক্সি চালানো শুরু করেন।
নিউইয়র্কের রাস্তায় কাজের সময় তিনি দেখেছেন—কীভাবে একজন সাধারণ চালক, অভিবাসী বা নিম্নবিত্ত শ্রমিক শহরের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হয়েও ন্যায্য সুযোগ পায় না। সেই বাস্তবতা থেকেই তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ২০২১ সালে তিনি কুইন্সের ৩৬ নম্বর জেলা থেকে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। মাত্র তিন বছর পর—২০২৫ সালে—তিনি দাঁড়ালেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে।
তার নির্বাচনী স্লোগান ছিল—“A City for the Many, Not the Money”, অর্থাৎ “অর্থের নয়, মানুষের শহর।” প্রচারণার মূল প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল: বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ (rent freeze), গণপরিবহন ধীরে ধীরে ফ্রি করা, পুলিশ জবাবদিহিতা ও কমিউনিটি সেফটি মডেল, ধনী করপোরেট ও বিলিয়নিয়ারদের ওপর বাড়তি কর, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবা। তাঁর প্রচারণায় স্বেচ্ছাসেবকদের সংখ্যা ছিল রেকর্ড — ২৫,০০০ এর ও বেশি। অধিকাংশই তরুণ, শিক্ষার্থী ও অভিবাসী পটভূমির মানুষ। রাজনৈতিক মহলে অনেকেই শুরুতে এটিকে “অসম্ভব মিশন” বলেছিলেন। কিন্তু ফলাফল দেখালো উল্টো চিত্র। মঙ্গলবারের নির্বাচনে জোহরান মামদানী পেয়েছেন ১,০৩৬,০৫১ ভোট (৫০.৪%), যেখানে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো পেয়েছেন ৮৫৪,৯৯৫ ভোট (৪১.৬%)। তৃতীয় স্থানে ছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া — ১৪৬,১৩৭ ভোট (৭.১%)। বিপুল ভোটের ব্যবধানে জোহরান জয়ী হন। এই ফলাফল শুধু রাজনৈতিক অঙ্কে নয়, সামাজিক বাস্তবতায়ও এক বিশাল পরিবর্তনের প্রতীক।
জোহরানের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রগ্রেসিভ রাজনীতির শীর্ষ ব্যক্তিরা — Bernie Sanders, Alexandria Ocasio-Cortez, Ilhan Omar ও Jamaal Bowman। এদের প্রত্যেকেই বলেছিলেন, নিউইয়র্কে “প্রকৃত জনকল্যাণের রাজনীতি” ফিরিয়ে আনতে জোহরানই সঠিক প্রতিনিধি। কুয়োমোর ক্যাম্পে সমর্থন ছিল বড় করপোরেট, রিয়েল-এস্টেট গ্রুপ এবং পুরনো প্রশাসনিক ধারা।
এই দুই ধারা—প্রগ্রেসিভ বনাম পুরনো প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি—এর সংঘাতেই গড়ে ওঠে ২০২৫ এর মেয়র নির্বাচন।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল অন্যরকম। বললেন “এটা এক বিপজ্জনক বার্তা”। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোহরানের জয়কে “নিউইয়র্কের পতনের সংকেত” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “একজন স্বঘোষিত সমাজতন্ত্রী এখন আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহরের মেয়র—এটা প্রমাণ করে আমাদের দেশ কতটা ভুল পথে যাচ্ছে।” প্রতিক্রিয়ায় জোহরান বলেছেন,“ডোনাল্ড ট্রাম্প, আমি জানি আপনি দেখছেন—তাহলে ভলিউমটা একটু বাড়িয়ে নিন।” এই সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়াটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়।
জোহরানের জয় উদযাপন করেছে পুরো নিউইয়র্ক, বিশেষ করে কুইন্স, ব্রঙ্কস, জ্যাকসন হাইটস ও ব্রুকলিনে অভিবাসী সম্প্রদায়। বিশেষ করে অভিবাসী ও মুসলিম কমিউনিটির আনন্দ ছিল নজরে পড়ার মতোন। বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি কমিউনিটির মানুষ ব্যানার হাতে রাস্তায় নেমে বলে, “Our Mayor, Our Hope — Zohran Mamdani!” নিউইয়র্কের ইতিহাসে এই প্রথম একজন মুসলিম মেয়র। এক অভিবাসীর সন্তান হয়ে মেয়র হওয়াকে অনেকেই অভিবাসী আমেরিকার “নতুন চেহারা” হিসেবে দেখছেন।
নিউইয়র্ক এখন বড় বড় সংকটে জর্জরিত—বাড়তি অপরাধ, গৃহহীনতা, পরিবহন ঘাটতি, বাজেট ঘাটতি এবং বাড়ির দাম বৃদ্ধির মতো সমস্যা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, “উদ্দীপনামূলক নেতৃত্ব” থাকলেও প্রশাসনিক বাস্তবতা কঠিন হবে। City University of New York-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেরি লরেন্স বলেন, “Mamdani-র জয় একটা আদর্শিক বিপ্লব। কিন্তু এখন তাকে বাস্তব নিউইয়র্কের অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।”
জোহরান মামদানীর এই জয় কেবল একজন রাজনীতিকের নয়—এটি এক প্রজন্মের জয়, যারা বিশ্বাস করে রাজনীতি মানে পরিবর্তন সম্ভব করা। তিনি বলেছেন,“এই শহর এমন এক জায়গা, যেখানে আমার মতো মানুষ মেয়র হতে পারে। আমি চাই, আগামী প্রজন্ম এটা বিশ্বাস করুক—তোমার শিকড় যত দূরেই হোক, নিউইয়র্ক তোমার ঘর।”
১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবেন নিউইয়র্ক সিটির ১১০-তম মেয়র হিসেবে। তার সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক, কিন্তু নিউইয়র্ক আজ আশা দেখছে— যে শহরে ট্যাক্সি চালকও মেয়র হতে পারে।##

