-- বিজ্ঞাপন ---

ভারতের পূর্ব উপকূলে ঘূর্ণিঝড় আর্নাবের তাণ্ডব, প্রাণহানি ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়

১৫ হাজার বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত, নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয় ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষ

ভারতের পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা প্রবল ঘূর্ণিঝড় আর্নাবের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়েছে জনপদ। কোথাও উপড়ে পড়েছে বিশাল গাছ, কোথাও ভেঙে গেছে বিদ্যুতের খুঁটি, আবার কোথাও পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষিজমি ও নিচু এলাকা। ঝড়ের তাণ্ডবে প্রাণহানির পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সড়ক যোগাযোগ ও কৃষিতে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগে থেকেই বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হলেও ঝড়ের পরও বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে ভারতের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি বলে জানানো হয়েছে।

কোথায়, কীভাবে আঘাত হানল আর্নাব?

ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, আর্নাব ছিল একটি ‘ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বা অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়। ২৮ অক্টোবর বুধবার ভোরে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হানে ঝড়টি। এর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়। ঝড়ের বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১১৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার; দমকা হাওয়ার গতি কোথাও ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে জানিয়েছে দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

উপকূল অতিক্রমের পর স্থলভাগের দিকে এগিয়ে ঝড়টি দুর্বল হতে শুরু করলেও এর প্রভাব দ্রুত কাটেনি। অন্ধ্রপ্রদেশের একাধিক জেলায় গাছপালা উপড়ে পড়ে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নিচু এলাকায় পানি জমে যায়।

প্রাণহানি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য

ঘূর্ণিঝড়ের পর হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। রয়টার্স ২৯ অক্টোবর সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ছয়জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একই দিনে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ঝড়-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সাতজনের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছ পড়ে যাওয়া এবং বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার মতো ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

এই পার্থক্যের কারণে হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত করতে সরকারি হালনাগাদ তথ্যের ওপর নজর রাখা জরুরি।

১৫ হাজার বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত

ঝড়ের অন্যতম বড় আঘাত এসেছে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডুর বক্তব্যের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ে অন্তত ১৫ হাজার বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়।

বৃহস্পতিবারের মধ্যে অধিকাংশ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলেও কোনাসীমা ও পশ্চিম গোদাবরী এলাকায় তখনও সমস্যা অব্যাহত ছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। উপড়ে পড়া গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি সরিয়ে সড়ক পরিষ্কার এবং জরুরি পরিষেবা স্বাভাবিক করার কাজও চলছিল।

কৃষিতে বড় ক্ষতির আশঙ্কা

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, অন্ধ্রপ্রদেশের প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার হেক্টর কৃষি ও উদ্যানজাত ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে। ঝড়ের বাতাসে ধানসহ বিভিন্ন ফসল মাটিতে শুয়ে পড়ে; কলা ও নারকেলবাগানেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

তবে কৃষির মোট আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

আগেই সরানো হয় ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষ

ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে আগাম সতর্কতা জারি করেছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্ধ্রপ্রদেশ ও প্রতিবেশী ওডিশা রাজ্য থেকে ঝড় আঘাত হানার আগে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয় এবং কয়েকটি ট্রেন ও ফ্লাইটের চলাচল বাতিল বা স্থগিত করা হয়। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ের দুর্যোগ মোকাবিলা দলগুলো কাজ করে।

বঙ্গোপসাগরের ঝড় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বঙ্গোপসাগর বিশ্বের অন্যতম ঘূর্ণিঝড়প্রবণ সামুদ্রিক অঞ্চল। এখান থেকে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ভারতের পূর্ব উপকূল, বাংলাদেশ এবং আশপাশের অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, প্রবল বাতাস ও কৃষিক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় জনবসতি, কৃষিজমি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুর্যোগের প্রভাব ঝড় থেমে যাওয়ার পরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

আর্নাবের ঘটনায় আগাম সতর্কতা ও মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগের প্রস্তুতি, নিরাপদ আশ্রয়, দ্রুত উদ্ধার এবং জরুরি পরিষেবা পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনা তারই আরেকটি উদাহরণ।

সূত্র: রয়টার্স, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস