-- বিজ্ঞাপন ---

১৪ টনের বোমা, মাটির নিচের দুর্গ ভাঙাই যার লক্ষ্য

মাটি ও কংক্রিটের বহু স্তর পেরিয়ে ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আঘাতের জন্য তৈরি যুক্তরাষ্ট্রের GBU-57 MOP

কাজী মনসুর/সিরাজুর রহমান#
মাটির ওপর থেকে হয়তো একটি পাহাড় ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। অথচ সেই পাহাড়ের কয়েকশ ফুট নিচে থাকতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অবকাঠামো কিংবা পারমাণবিক গবেষণার কেন্দ্র। প্রচলিত বোমার আঘাত সেখানে পৌঁছানো কঠিন। তাই এমন লক্ষ্যবস্তুর জন্য তৈরি হয়েছে এমন এক বোমা, যার ওজন প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড বা ১৪ টন। নাম GBU-57 Massive Ordnance Penetrator (MOP)।

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই অ-পারমাণবিক বোমাটি সাধারণ কোনো বিস্ফোরক অস্ত্র নয়। এর নকশার মূল উদ্দেশ্য হলো মাটি, পাথর ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো ভেদ করে ভূগর্ভস্থ স্থাপনার কাছাকাছি পৌঁছানো এবং এরপর বিস্ফোরণ ঘটানো। এ কারণে এর শক্তির বড় অংশ শুধু বিস্ফোরকে নয়, বিশাল ওজন, শক্তিশালী penetrator body এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রযুক্তির মধ্যেও নিহিত।

মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, GBU-57-এর ওজন প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ দশমিক ৫ ফুট। এর মধ্যে ৫ হাজার ৩০০ পাউন্ডের বেশি বিস্ফোরক রয়েছে। বাকি অংশে রয়েছে শক্তিশালী কাঠামো, guidance system, fuze এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান।

বোমাটির বিশেষত্ব হলো—এটি লক্ষ্যবস্তুর ওপর পড়ে সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য তৈরি নয়। বরং এর penetrator body প্রথমে মাটি বা শক্ত কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর নির্ধারিত সময় বা অবস্থানে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য fuze ব্যবস্থা কাজ করে। ফলে ভূগর্ভস্থ স্থাপনার ভেতরে বিস্ফোরণের শক্তি পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।

প্রকাশ্য মার্কিন সামরিক নথিতে GBU-57-এর underground penetration capability প্রায় ২০০ ফুট পর্যন্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যাকে সব ধরনের মাটি, পাথর বা ভূগর্ভস্থ কাঠামোর ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যায় না। ভূতাত্ত্বিক গঠন, কংক্রিটের শক্তি, reinforcement, কাঠামোর বিন্যাস এবং আঘাতের পরিস্থিতির ওপর penetration-এর ফল নির্ভর করে।

একইভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রায় ৬০ ফুট reinforced concrete ভেদ করার সক্ষমতার কথাও বলা হয়েছে। তবে বোমাটির প্রকৃত সর্বোচ্চ penetration performance-এর পূর্ণ তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ফলে প্রচলিত বিভিন্ন সংখ্যাকে সম্ভাব্য বা নির্দিষ্ট পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখা গেলেও সেগুলোকে সব ধরনের ভূগর্ভস্থ স্থাপনার জন্য নিশ্চিত সীমা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

GBU-57-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর precision guidance system। নির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থলের দিকে বোমাটিকে পরিচালিত করতে এ ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়। বোমার পেছনের lattice fin-গুলোও এর উড্ডয়নপথ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

তবে শুধু সঠিক জায়গায় পৌঁছানোই যথেষ্ট নয়। ভূগর্ভস্থ শক্তিশালী স্থাপনার ক্ষেত্রে কখন বিস্ফোরণ ঘটবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য MOP-এ hard-target fuze technology ব্যবহৃত হয়েছে। মার্কিন সামরিক নথিতে time delay এবং void-sensing ধরনের fuze capability-এর উল্লেখ রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বোমাটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর অতিক্রম করার পর উপযুক্ত পর্যায়ে বিস্ফোরিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা।

GBU-57-এর বিশাল ওজনের কারণে এটি সাধারণ যুদ্ধবিমান দিয়ে বহন করা সম্ভব নয়। অস্ত্রটি মূলত B-2 Spirit stealth bomber-এর সঙ্গে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। B-2-এর মতো দীর্ঘপাল্লার stealth bomber শত্রুর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছে এই ভারী অস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে।

GBU-57 নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে এর ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালের জুনে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার বিরুদ্ধে Operation Midnight Hammer পরিচালনা করে। মার্কিন সামরিক ও কংগ্রেসনাল নথি অনুযায়ী, অভিযানে সাতটি B-2 বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয় এবং মোট ১৪টি GBU-57 নিক্ষেপ করা হয়। Fordow ও Natanz-এর মতো ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ছিল অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

মার্কিন বিমানবাহিনী পরবর্তীতে এই অভিযানকে GBU-57-এর প্রথম operational combat employment হিসেবে উল্লেখ করে। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা ও প্রস্তুতির পর ২০২৫ সালেই প্রথমবার বাস্তব যুদ্ধে এই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।

তবে ওই হামলার পর GBU-57-এর প্রকৃত ধ্বংসক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও ওঠে। মার্কিন পক্ষ থেকে ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা বলা হলেও বিভিন্ন মূল্যায়নে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিয়ে পার্থক্য দেখা যায়। বিশেষ করে Fordow-এর মতো পাহাড়ের গভীরে নির্মিত স্থাপনার মূল অবকাঠামো কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার পূর্ণ স্বাধীন মূল্যায়ন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে এই অভিযান GBU-57-এর বাস্তব যুদ্ধ-ব্যবহারের প্রমাণ দিলেও এর সর্বোচ্চ penetration capability সম্পর্কে সব প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।

এখানেই GBU-57-এর প্রকৃত বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্ট হয়। এটি কেবল একটি শক্তিশালী বোমা নয়; বরং ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত অস্ত্রব্যবস্থা। এর বিশাল ভর, penetrator body, precision guidance এবং delayed-fuze technology একসঙ্গে কাজ করার কথা।

এর কার্যকারিতা আবার শুধু বোমার ওপর নির্ভর করে না। ভূগর্ভস্থ কোনো স্থাপনার অবস্থান সম্পর্কে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য, স্থাপনার গভীরতা, নির্মাণে ব্যবহৃত উপাদান, অভ্যন্তরীণ বিন্যাস এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর অবস্থানও বড় ভূমিকা রাখে। একটি বোমা স্থাপনার প্রবেশপথ ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু তাতে পুরো ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সের সব গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধ্বংস হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এই কারণে GBU-57-কে নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তার বিস্ফোরক শক্তি নয়; বরং কতটা গভীরে গিয়ে, কোন ধরনের ভূগর্ভস্থ কাঠামোর কতটা ক্ষতি করতে পারে—তা নিয়ে।

ভবিষ্যতে এই ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রজন্মের B-21 Raider stealth bomber-কে দীর্ঘপাল্লার penetrating strike mission-এর জন্য তৈরি করা হচ্ছে। তবে GBU-57-এর সঙ্গে B-21-এর পূর্ণ operational integration সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য এখনও সীমিত।

প্রায় ১৪ টন ওজনের এই বোমাটি তাই আধুনিক প্রচলিত অস্ত্রের একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। পারমাণবিক অস্ত্রের মতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির জন্য নয়, বরং এমন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য এটি তৈরি—যেখানে মাটির গভীরতা এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সাধারণ বোমাকে অকার্যকর করে দিতে পারে।

আর ২০২৫ সালের জুনের অভিযান GBU-57-এর ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় খুলেছে। এতদিন যার সক্ষমতা নিয়ে মূলত পরীক্ষা ও সামরিক নথির ভিত্তিতে আলোচনা হয়েছে, সেটি এখন বাস্তব যুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এর প্রকৃত সীমা কোথায়—কত গভীর, কত শক্তিশালী এবং কতটা সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনা এটি ধ্বংস করতে পারে—সেই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর এখনও প্রকাশ্যে নেই।

মাটির ওপর থেকে যার কিছুই দেখা যায় না, সেই অদৃশ্য ভূগর্ভস্থ দুর্গের বিরুদ্ধে আকাশ থেকে নেমে আসা ১৪ টনের এই অস্ত্র কতটা কার্যকর—আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন সেটিই।#