কাজী মনসুর#
চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু এবার সংকটের মাত্রা এবং এর নেপথ্যের ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে। একদিকে বিদেশ থেকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি নিয়ে একের পর এক জাহাজ মহেশখালীর টার্মিনালে আসছে, অন্যদিকে সেই এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ব্যবস্থায় সামান্য ধাক্কা লাগলেই চট্টগ্রামের শিল্পকারখানায় নেমে আসছে অচলাবস্থা। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে উৎপাদন চালানো যাচ্ছে না, কোথাও কারখানা বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সিএনজি স্টেশনেও দেখা দিয়েছে চাপ; ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
সাম্প্রতিক এই সংকটের শুরু মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর। ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত ভাসমান টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। একটি টার্মিনাল অচল হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর মধ্যেই অন্য টার্মিনালে এলএনজি কার্গো গ্রহণে জটিলতা এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাহাজ ভিড়তে না পারায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়। ফলে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা শুধু একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি নয়। বরং প্রশ্ন উঠেছে—দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা কি অতিরিক্তভাবে কয়েকটি আমদানি টার্মিনাল এবং বিদেশি এলএনজি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে?
আজ ১৫ আগস্ট মহেশখালীর দুই টার্মিনাল থেকেই আবার গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে সেই স্বস্তি এখনও পুরোপুরি পৌঁছায়নি। কারণ জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের পরিমাণ বাড়লেই চট্টগ্রামের শিল্পে সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ স্বাভাবিক হয় না। গ্যাসের জাতীয় চাহিদা, বিভিন্ন খাতে অগ্রাধিকার এবং অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দ, সবকিছুর ওপর নির্ভর করে শেষ পর্যন্ত কোন শিল্প কতটা গ্যাস পাবে। আর এখানেই চট্টগ্রামের সংকটের আসল গল্প।
চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা কত, সরবরাহ কত?
চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। বন্দর, ইস্পাত, পোশাক, টেক্সটাইল, ডাইং, কেমিক্যাল, খাদ্য, কাচ, সিরামিক, জাহাজভাঙা ও অন্যান্য ভারী শিল্পের বড় একটি অংশ এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে। এই শিল্পের বড় অংশের উৎপাদন ব্যবস্থা সরাসরি গ্যাসনির্ভর। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আওতাধীন চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ সাম্প্রতিক সংকটে সরবরাহ নেমে এসেছে চাহিদার তুলনায় অনেক নিচে। কিছু সময় সরবরাহ প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে চাহিদার অর্ধেকেরও কম গ্যাস দিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানায়। গ্যাসের চাপ কমে গেলে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ কমে না। অনেক কারখানার বয়লার, ফার্নেস, জেনারেটর ও অন্যান্য উৎপাদন যন্ত্রপাতিই স্বাভাবিকভাবে চালানো যায় না। ফলে কারখানা খোলা থাকলেও উৎপাদন ক্ষমতা থাকে না।
ভারী শিল্পে আগে কোপ
গ্যাসের সংকট দেখা দিলে সরবরাহের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার দিতে হয় আবাসিক গ্রাহক, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং জরুরি সেবাকে। ফলে শিল্পে সরবরাহ কমে যায়। চট্টগ্রামেও এবার ভারী শিল্পকে উৎপাদন কমানো বা সাময়িক বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ শুধু শিল্পমালিকের আর্থিক ক্ষতি নয়। একটি কারখানা বন্ধ হলে তার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক, কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন, বন্দর, রপ্তানি এবং স্থানীয় ব্যবসা, সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো বন্দরনির্ভর শিল্পনগরীতে এই প্রভাব দ্রুত জাতীয় অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সংকটের কেন্দ্রে মহেশখালী
বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র মহেশখালী। বিদেশ থেকে এলএনজি জাহাজে করে সেখানে আনা হয়। এরপর ভাসমান FSRU (Floating Storage and Regasification Unit)-এ এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করা হয় সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে প্রবেশ করে। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাটি দাঁড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর। এলএনজি আমদানি → জাহাজ → মহেশখালী টার্মিনাল → রিগ্যাসিফিকেশন → জাতীয় গ্রিড → চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ। এই শৃঙ্খলের যেকোনো একটি জায়গায় বড় ধরনের সমস্যা হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো ব্যবস্থায়।
সাম্প্রতিক সংকট তারই বাস্তব উদাহরণ।
এক টার্মিনালের আগুনে কেন এত বড় সংকট? ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়।একটি বড় টার্মিনাল দীর্ঘ সময় অচল থাকায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর পরপরই অন্য টার্মিনালকে বেশি চাপ নিতে হয়। কিন্তু সেখানেও এলএনজি কার্গো গ্রহণে সমস্যা তৈরি হলে সংকট আরও তীব্র হয়। এখানে বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়। আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেই আমদানি ও রিগ্যাসিফিকেশন অবকাঠামোয় পর্যাপ্ত বিকল্প ব্যবস্থা কতটা তৈরি হয়েছে?
সমুদ্রের আবহাওয়াও যখন গ্যাসের সরবরাহ নির্ধারণ করে
সাম্প্রতিক ঘটনায় আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। এলএনজি শুধু কিনলেই হবে না; সেটি সময়মতো দেশে পৌঁছাতে হবে এবং নিরাপদে টার্মিনালে খালাস করতে হবে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ মহেশখালীতে সময়মতো ভিড়তে না পারলে টার্মিনালে গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় মজুত তৈরি হয় না। ফলে টার্মিনাল সচল থাকলেও সরবরাহ কমে যেতে পারে। এটি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার একটি বড় ঝুঁকি। আজ সরবরাহ বাড়ছে, কিন্তু স্বস্তি ফিরতে সময় লাগবে ১৫ আগস্ট থেকে মহেশখালীর দুই টার্মিনালেই সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। সামিটের টার্মিনাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আংশিক সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহও বেড়েছে। তবে চট্টগ্রামের শিল্পকারখানায় স্বাভাবিক চাপ ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। কারণ জাতীয় গ্রিডে গ্যাস প্রবেশের পর সেটি বিভিন্ন খাত ও অঞ্চলের মধ্যে বণ্টন করা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, আবাসিক গ্রাহক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পর শিল্পে কতটা গ্যাস দেওয়া সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
শিল্পে গ্যাসের সংকট মানে শুধু উৎপাদন কমা নয়
চট্টগ্রামের শিল্পকারখানাগুলো দীর্ঘ সময় গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ না পেলে ক্ষতির বহুমাত্রিক প্রভাব তৈরি হবে। প্রথমে কমবে উৎপাদন। তারপর বাড়বে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে রপ্তানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিদেশি ক্রেতার আস্থা কমতে পারে। শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমতে পারে। সবশেষে এর প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও জাতীয় রাজস্বে। অর্থাৎ শিল্পে গ্যাস সরবরাহকে শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির সমস্যাও।
আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকিও বাড়ছে
বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহে এলএনজির গুরুত্ব যত বাড়ছে, ততই আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতাও বাড়ছে। কাতারসহ কয়েকটি দেশ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আসে। কিন্তু যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কিংবা সরবরাহকারী দেশের নিজস্ব চাহিদা বেড়ে গেলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশ বিপদে পড়তে পারে। ২০২৬ সালে কাতারএনার্জির এলএনজি সরবরাহেও বড় ধরনের বিঘ্নের খবর এসেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের গ্যাস নিরাপত্তা এখন আর শুধু দেশের গ্যাসক্ষেত্র বা পাইপলাইনের ওপর নির্ভরশীল নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি।
তাহলে সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রথমত, দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করতে হবে। তৃতীয়ত, এক বা দুটি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। চতুর্থত, গ্যাস সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জরুরি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। পঞ্চমত, চট্টগ্রামসহ বড় শিল্পাঞ্চলের জন্য নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ পরিকল্পনা থাকতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি হিসাবের সঙ্গে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নগরায়ণের পরিকল্পনাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
যে প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে
আজ মহেশখালীর টার্মিনালগুলো আবার গ্যাস দিচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে চট্টগ্রামের পরিস্থিতিও হয়তো অনেকটা স্বাভাবিক হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংকট একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনেছে। বিদেশ থেকে এলএনজি আসছে। টার্মিনাল আছে। পাইপলাইন আছে। জাতীয় গ্রিড আছে। তারপরও একটি টার্মিনালের অগ্নিকাণ্ড, একটি এলএনজি জাহাজের বিলম্ব কিংবা কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়া পুরো চট্টগ্রামের শিল্পব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। তাহলে সমস্যা শুধু গ্যাসের ঘাটতিতে নয় সমস্যা রয়েছে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতায়।
চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পাঞ্চলকে যদি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি দেওয়া না যায়, তাহলে বন্দরের সক্ষমতা, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি, কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ থাকবে না। সাম্প্রতিক সংকট তাই সাময়িকভাবে কেটে গেলেও প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে, এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়ানোই কি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, নাকি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি যেখানে একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেও চট্টগ্রামের শিল্পের চাকা থেমে যাবে না?##

