সিরাজুর রহমান#
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটি ইন্দোনেশিয়া তাদের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি উন্নত মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান চেংদু জে-১০সিই কেনার পথে এগোচ্ছে। প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ৪২টি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এই লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর চীন ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। তবে ২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাস পর্যন্ত চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়নি এবং এখনো মূল্য, সরবরাহ সময়সূচি ও প্রযুক্তিগত শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা চলছে।
ব্যয় ও প্যাকেজের বাস্তবতা
প্রাথমিকভাবে একটি জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের বেসিক মূল্য প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, ইন্দোনেশিয়ার প্রস্তাবিত প্যাকেজে রয়েছে বিস্তৃত লজিস্টিক সাপোর্ট, পাইলট ও গ্রাউন্ড ক্রু প্রশিক্ষণ, উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা। ফলে প্রতিটি বিমানের গড় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজসহ প্রতিটি বিমানের কার্যকর খরচ ২০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
চীনের রপ্তানি বাজারে সম্ভাব্য মাইলফলক
চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান এর পর ইন্দোনেশিয়া হবে তৃতীয় দেশ, যারা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান পরিচালনা করবে। এ পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে চীনের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিযোগিতামূলক দামে উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে চীন বৈশ্বিক অস্ত্রবাজারে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পুরোনো বহর প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা
বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার বিমানবাহিনীর বহরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি F-16 Fighting Falcon, রাশিয়ার Sukhoi Su-30 ও Sukhoi Su-27 এবং ফ্রান্সের Dassault Rafale যুদ্ধবিমান। এর মধ্যে এফ-১৬এ/বি এবং সু-২৭ প্ল্যাটফর্মগুলো তুলনামূলক পুরোনো হয়ে পড়ায় সেগুলো ধাপে ধাপে অবসরে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন প্রজন্মের জে-১০সিই এই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উন্নয়ন
চীনের Chengdu Aircraft Corporation নির্মিত জে-১০সি/সিই সিরিজকে ৪.৫ প্রজন্মের উন্নত মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পূর্ববর্তী জে-১০এ ও জে-১০বি মডেলের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এতে আধুনিক অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (AESA) রাডার, উন্নত এভিয়নিক্স এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে।
প্রথম দিকে রাশিয়ার তৈরি AL-31F engine ব্যবহার করা হলেও, বর্তমানে নতুন সংস্করণে চীনের নিজস্ব WS-10B engine সংযোজন করা হয়েছে। এই ইঞ্জিন অধিক থ্রাস্ট ও নির্ভরযোগ্যতা প্রদান করে বলে দাবি করা হয়।
পারফরম্যান্স ও অপারেশনাল সক্ষমতা
জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের সর্বোচ্চ গতি প্রায় ম্যাক ২.১ এবং এর কমব্যাট রেঞ্জ আনুমানিক ২,৬০০ কিলোমিটার। এটি প্রায় ৫৯ হাজার ফুট উচ্চতায় মিশন পরিচালনা করতে সক্ষম। সর্বোচ্চ পেলোড ক্ষমতা প্রায় ৭.২ টন, যা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বহনের সুযোগ দেয়।
আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থা
এই যুদ্ধবিমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এর অস্ত্রসজ্জা। এটি চীনের তৈরি PL-15 missile বহনে সক্ষম, যা দীর্ঘপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে আঘাত হানতে ব্যবহৃত হয়। মিসাইলটির এক্সপোর্ট সংস্করণ পিএল-১৫ই-এর রেঞ্জ প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার হলেও মূল সংস্করণের ক্ষেত্রে এর রেঞ্জ আরও বেশি বলে দাবি করা হয়।
আঞ্চলিক কৌশলগত প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দোনেশিয়ার এই পদক্ষেপ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে এটি দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে, অন্যদিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে।
একই সঙ্গে এটি চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রপ্তানির প্রতিযোগিতাকেও নতুন মাত্রা দিতে পারে। বিশেষ করে এমন একটি সময়ে, যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে, তখন এ ধরনের চুক্তি ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ ইন্দোনেশিয়ার জন্য কেবল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে তা শুধু ইন্দোনেশিয়ার বিমানবাহিনী নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও শক্তির ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।
তথ্যসূত্র: Wikipedia, South China Morning Post, TurDef (Global Defence News)

